মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্দেশে কড়া কিন্তু কৌশলী বার্তা দিয়েছেন, যাকে বিশ্লেষকরা ‘ভালবাসার আবরণে কঠোর হুঁশিয়ারি’ হিসেবে দেখছেন।
শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভ্যালেন্টাইনস ডে উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ককে অবিচ্ছেদ্য পারিবারিক বন্ধনের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করেন—এই সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হলে ইউরোপকে তাদের নীতি ও মূল্যবোধে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে।
জার্মানির মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন-এর মঞ্চে রুবিও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কেবল সেই ইউরোপের সঙ্গেই কৌশলগত অংশীদারিত্ব বজায় রাখতে আগ্রহী, যারা খ্রিস্টীয় মূল্যবোধ ধারণ করবে, নিজেদের সীমান্ত সুরক্ষিত রাখবে এবং বর্তমান জলবায়ু নীতি ও উদারপন্থী রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্বিবেচনা করবে। তার বক্তব্যে অনেকটা ‘দম্পতি থেরাপি’র সুর—পরিবর্তন আনো, নতুবা সম্পর্ক ঝুঁকিতে পড়বে।
এই মন্তব্য সম্মেলনে উপস্থিত ইউরোপীয় মধ্যপন্থী নেতাদের জন্য ছিল অস্বস্তিকর। আয়োজকরাও আগেই সতর্ক করেছিলেন, বিশ্ব রাজনীতি এখন ‘রেকিং বল পলিটিক্স’ বা ধ্বংসাত্মক ক্ষমতার রাজনীতির দিকে এগোচ্ছে। রুবিওর ভাষণে সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখছেন অনেকে, যেখানে ইউরোপের উগ্র-ডানপন্থী বিরোধী শক্তির কিছু এজেন্ডার প্রতিধ্বনি শোনা গেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এর আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ইউরোপের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন তুলে ধরেন। কিন্তু রুবিও তাদের বক্তব্য পাশ কাটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি’কেই অগ্রাধিকার দেন। গত বছরের বিতর্কিত গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ তিনি সরাসরি উল্লেখ না করলেও দ্বিপাক্ষিক টানাপড়েনের ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট।
সম্মেলনের আলোচনার আরেকটি বড় কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তার ভাষণে রাশিয়ার আগ্রাসনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে ইউরোপকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রুশ বাহিনী প্রতি কিলোমিটার ভূমি দখলে বিপুল প্রাণহানি ঘটাচ্ছে—যা যুদ্ধের নিষ্ঠুরতা স্পষ্ট করে।
জেলেনস্কি পরোক্ষভাবে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর মধ্যে কথিত ‘গোপন সমঝোতা’ প্রসঙ্গেও কটাক্ষ করেন। শান্তির নামে ইউক্রেনকে ছাড় দিতে চাপ সৃষ্টির সমালোচনাও করেন তিনি।
সব মিলিয়ে এবারের মিউনিখ সম্মেলন আটলান্টিকের দুই তীর—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—এর সম্পর্কের গভীর ফাটলকেই সামনে এনেছে। ইউরোপ যখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর অঙ্গীকার করছে, তখন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতেও পরিবর্তন।
আগামী সম্মেলনের আগে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন এই সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর ইউক্রেনের মতো দেশগুলো আশঙ্কা করছে—মিত্রদের এই টানাপড়েনে যেন তাদের অস্তিত্ব সংকটে না পড়ে।






















