নিজস্ব প্রতিবেদক: পটুয়াখালী জেলা কারাগারের নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে দৈনিক আজকালের সংবাদ-এ প্রকাশিত ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় পর্ব প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে দফায় দফায় বৈঠকে বসেছেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদার এবং পটুয়াখালী জেলা কারাগারের জেল সুপার মোহাম্মদ আতিকুর রহমান।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে জেলা প্রশাসনে প্রভাব বিস্তারকারী অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (আইসিটি) মোহাম্মদ তারেক হাওলাদারকে ঘিরেই কারাগারের নানা অনিয়ম নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
বিশ্বস্ত একাধিক সূত্র জানায়, বুধবার সকাল থেকে কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসার পর পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করেন। বৈঠকগুলোতে অভিযোগগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং বিষয়টি কীভাবে ধামাচাপা দেওয়া যায়—সেসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সূত্রগুলো আরও দাবি করেছে, সংবাদ প্রকাশের পর দৈনিক আজকালের সংবাদ পত্রিকা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদককে কীভাবে প্রশাসনিকভাবে চাপে রাখা যায়—সেই বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ :
কারাগারে থাকা বন্দিদের স্বজনরা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বন্দির স্বজন বলেন, “কারাগারে থাকা আত্মীয়ের সঙ্গে দেখা করা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠাতে গেলেও নানা অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দিলে নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।”
আরেকজন স্বজন বলেন, “বছরের পর বছর ধরে এসব অনিয়ম চলছে। কিন্তু ভয়-ভীতির কারণে কেউ মুখ খুলতে পারে না। এখন সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসায় আমরা কিছুটা সাহস পাচ্ছি।”
কারারক্ষীদের মধ্যেও চাপা অসন্তোষ:
কারাগারের কয়েকজন কারারক্ষী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির কারণে পুরো কারা প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
একজন কারারক্ষী বলেন, “অনেক বিষয় আমরা জানি, কিন্তু বলতে পারি না। কারণ বললেই চাকরি হারানোর ভয় থাকে। অথচ কিছু লোকের কারণে পুরো কারাগারের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।”
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া :
পটুয়াখালীর সচেতন মহল মনে করছে, কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির অভিযোগ অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “কারাগার রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সেখানে যদি এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।”
কর্তৃপক্ষের নীরবতা:
ধারাবাহিকভাবে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এতে জনমনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের বক্তব্য :
দৈনিক আজকালের সংবাদ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবুল হোসেন তালুকদার বলেন, “জনস্বার্থে এবং তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই পটুয়াখালী জেলা কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিকদের ভয়ভীতি বা চাপ প্রয়োগ করে সত্য প্রকাশ বন্ধ করা যাবে না। বরং অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”
তদন্তের দাবি :
সচেতন মহল মনে করছে, পটুয়াখালী জেলা কারাগারের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত হবে। আমার টিম তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”






















